KSRM
Home ইন্টারন্যাশনাল বহু জনগোষ্ঠীর ঐক্যের প্রতীক ছিলেন আফগানিস্তানের শেষ রাজা জহির শাহ

বহু জনগোষ্ঠীর ঐক্যের প্রতীক ছিলেন আফগানিস্তানের শেষ রাজা জহির শাহ

0

আন্তর্জাতিক কমিউনিটি/ইতিহাস/রাজনীতি/নিউজ ডেস্ক :

বহু জনগোষ্ঠীর আফগানিস্তান একসময় ছিল অনেকটা শান্তির জনপদ । শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্পকলা চর্চায় ছিল অনন্য । পশতু জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতির সাথে ছিল দারি(ফার্সি), তাজিক, উজবেক ও তুর্কী জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় মেলবন্ধন। পশতু জনগোষ্ঠীর দেশ হলেও পার্শ্ববর্তী পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, ইরান ও চীন সহ অনেক ভাষাভাষী মানুষের সৌহার্দ্যপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ ছিল আফগানিস্তান।
মহান সাধক জালালুদ্দিন রুমি ও সুফীবাদের আদর্শে সুমহান ইসলামী সভ্যতার লীলাভূমি সমরখন্দ ও বোখারার পবিত্র বাতাস বয়ে যেত আফগানিস্তানের পাহাড়ী জনপদ জুড়ে। সমুদ্র না থাকলেও হিন্দুকুশ ও কারাকোরাম পর্বতমালার পাদদেশে বয়ে যাওয়া আমু নদীর পানি প্রবাহ সিক্ত করত পাথরের রুক্ষ আবহাওয়ায় কঠিন আফগানদের হ্নদয়।
ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর শান্তিপূর্ণ সামাজিক সহবস্থান। রাজতন্ত্র থাকলেও ছিল পার্লামেন্ট ও আধুনিক গনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। রাজা জহির শাহ ছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক মাত্র। কারন অনেক জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত আফগানিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখার জন্য রাজতান্ত্রিক সরকারের প্রয়োজন ছিল। রাজা রাষ্ট্রের প্রধান হলেও ছিল মন্ত্রীসভা, কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ও প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা।
১৯৭৩ সালে রাজা জহির শাহ দেশের বাইরে ইটালিতে চিকিৎসাৎসাধীন থাকাকালে আফগানিস্তানের অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে তারাই আত্নীয় প্রধানমন্ত্রী জেনারেল দাউদ খান। জহির শাহ ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে থাকেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজতন্ত্র উৎখাত করে সেদিন গনতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চালু হবে বলা হলেও সেই থেকে আফগানিস্তানের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসে নি। বরং একের পর এক অভ্যুত্থানের চেষ্টা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, কম্যুনিস্টদের তৎপরতা ও বহিঃশত্রুদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। এরই প্রেক্ষিতে ঘটে যায় আরেকটি অভ্যুত্থান। ১৯৭৮ সালে চাউর বিপ্লবের নামে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তান (পিডিপিএ) ক্ষমতা দখল করে।  নূর মুহম্মদ তারাকী রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। কিন্তু  সরকারী দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায় অনেকগুলো সরকারবিরোধী সশস্ত্র দল গঠিত হয় এবং ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে আফগানিস্তানের বড় একটি অংশ জুড়ে বিদ্রোহ দেখা দেয়। সরকারের মধ্যেই অন্তদ্বন্দ্ব ও অস্থিতিশীলতার কারনে ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে হাফিজুল্লাহ আমিনের সমর্থকেরা তারাকীকে ক্ষমতাচ্যুত করে আমিনকে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করে। কিন্তু হাফিজুল্লাহ আমিন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশংকায় প্রতিবেশী কমিউনিস্ট শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে ঢুকে পড়ে। তাদের হস্তক্ষেপে ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে এক অভ্যত্থানে নিহত হন হাফিজুল্লাহ আমিন।
সোভিয়েতরা ক্ষমতায় বসায় বারবাক কারমালকে। মূলত তখন থেকেই আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পথ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠে। কারন বিদেশি সৈন্যদের উপস্থিতি স্বাধীনচেতা আফগানরা মেনে নিতে পারে নি। তাই তারা বিভিন্ন মুজাহেদিন গ্রুপের মাধ্যমে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে।
এক পর্যায়ে বারবাক কারমাল মস্কোতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে ক্ষমতায় আসেন নাজিবুল্লাহ।
১৯৯২ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে কিছুদিনের জন্য এক হয়ে ইসলামী সরকার গঠন করেছিল আফগান মুজাহেদিন গ্রুপগুলো। কিন্তু যারা একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়েছিল সেই ইসলামী গ্রুপগুলো অল্প কিছুদিনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে ভাতৃঘাতি সংঘাত, মারামারি, হানাহানিতে লিপ্ত হয়। তাদের মধ্যে মারামারির সুযোগে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা দখল করে বসে তালেবানরা। সাবেক রাস্ট্রপতি নাজিবুল্লাহকে মেরে রাস্তায় লাইটপোস্টে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে তালেবানদের মেনে নিতে পারে নি অন্যান্য ইসলামী মুজাহেদিন গ্রুপগুলো। তারা সম্মিলিতভাবে নর্দার্ন এলায়েন্স বা উত্তরাঞ্চলীয় জোট গঠন করে তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়তে থাকে। সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা বাঘা বাঘা মুজাহেদিন নেতারা একজোট হয়ে তালেবানদের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত হয়। এ সুযোগে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র আল কায়েদা দমনের নামে ঢুকে পড়ে আফগানিস্তানে। তাদের কাছে তালেবানদের পতন হলে দীর্ঘ নির্বাসন থেকে নিজ দেশে ফিরে আসেন রাজা জহির শাহ। তিনি স্বদেশে ফিরে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে পার্লামেন্টারী শাসন ব্যবস্থা চালু করার আহবান জানান। ২০০২ সালে তাকে জাতির পিতা উপাধি প্রদান করা হয়। হামিদ কারজাই হন প্রেসিডেন্ট।  তখন আফগানিস্তানে পার্লামেন্ট লয়াজিরগা চালু হয়। রাজা জহির শাহ ঘোষণা করেন, আমি আর রাজত্ব চাই না, আপনারা সবাই লয়াজিরগার আদর্শে দেশ পরিচালনা করুন। দেশের মানুষ আমাকে বাবা বলে ডাকে, এটাই আমার বড় পাওয়া। কিন্তু দেশে ফিরে রাজা জহির শাহ আর বেশীদিন বাঁচেন নি। বার্ধক্যজনিত কারনে ৯২ বছর বয়সে তিনি ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই পরলোকগমন করেন। কাবুলের অদূরে মারানজান পাহাড়ে এক সমাধিতে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। আফগানরা এখনো তাকে অনুভব করেন। তিনি ছিলেন আফগানিস্তানের বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু জনপদে বিভক্ত আফগান জনগনের ঐক্যের প্রতীক। অনেকেই বলেন, আফগানিস্তানের জাতীয় সংহতি ও ঐক্যের প্রতীক রাজা জহির শাহের মৃত্যুর পর সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখার যে সম্ভাবনাটুকু ছিল তা হারিয়ে গেছে। সংঘাত বিক্ষুব্ধ আফগানিস্তানে নিভে যায় আশার শেষ প্রদীপ।

 

…………..
সরোয়ার আমিন বাবু।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক।
সিআরএফ।

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here