আন্তর্জাতিক কমিউনিটি/ইতিহাস ঐতিহ্য /নিউজ ডেস্ক :
হিরোশিমা দিবস যখন আসে তখন আমার হলিউডের বিখ্যাত সেই একশান সিনেমা ‘টারমিনেটর’ এর কথা মনে পড়ে। জ্বলেপুড়ে বিধ্বস্ত সেই টারমিনেটর নামক রোবটটি যখন একসময় বলে উঠে, I am back (আমি আবারো ফিরে এসেছি), তখন সিনেমার দর্শকরা অনুভব করেন একপ্রকার থ্রিল ও সাসপেন্স। এটম বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত ও জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়া জাপানের হিরোশিমা শহরও যেন সেভাবে ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনী ।
এখনকার হিরোশিমা দেখলে মনেই হবে না আজ থেকে প্রায় পঁচাত্তর বছর আগে শহরটি এটম বোমার আঘাতে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। আজ হিরোশিমায় গাড়ী চলছে অজস্র, মানুষ হেসে খেলে করছে হাটাহাটি । যার যার মত করে ছুটছে কর্মক্ষেত্রে, অফিসে, বাসায়। মনোরম পার্কের সবুজ ঘাস, রাস্তার পাশে সারি সারি গাছপালা আর ফুলে ফুলে সুশোভিত চারদিক। সতেজ, পরিচ্ছন্ন ও প্রানবন্ত এক শহর এখন হিরোশিমা।
তবে ইতিহাসের সেই ভয়াবহতম ঘটনাকে স্বাক্ষী হিসেবে রেখে হিরোশিমার একটি ঐতিহ্যবাহী দালান ও বিশাল প্রাঙ্গণকে মিউজিয়াম হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছে জাপানিরা। যেন যুগে যুগে বিশ্বের বিভিন্ন জনপদ থেকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এসে দেখে যেতে পারে যুদ্ধের ভয়াবহতার চিহ্ন। নিদর্শনগুলো দেখে শিক্ষা নিয়ে যেন বলে উঠে, যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।
কি ঘটেছিল সেদিন?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট আমেরিকান বোমারু বিমান থেকে নিক্ষিপ্ত এটম বোমায় জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল জাপানের হিরোশিমা শহরটির বিশাল জনপদ। আগস্টের ঐদিনে রোদমাখা এক সকালে জাপানি সময় ৮.১৬ মিনিটে আমেরিকার ‘এনোলা গে’ বি-২৯ বোমারু বিমান থেকে ইতিহাসের প্রথম এটম বোমা ‘লিটল বয়’ ফেলা হয়েছিল। প্রায় ৮০,০০০(আশি হাজার)মানুষ তৎক্ষনাৎ মরে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। প্রায় ৩৫,০০০(পঁয়ত্রিশ হাজার) মানুষ মারাত্মক আহত ও বিকলাঙ্গ হয়। ভয়ানক তেজস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পরবর্তীতে মারা পড়ে আরো ৬০,০০০( ষাট হাজার) মানুষ। নেমে এসেছিল ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। ভেঙ্গে পড়েছিল জাপানের অর্থনীতি, রাজনীতি ও আর্থসামাজিক অবস্থা। যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল জাপানের সামরিক বাহিনী। কিন্তু মেধা, মনন,প্রজ্ঞা, প্রযুক্তি ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে জাপানিরা ধ্বংসস্তুপের মাঝ থেকে আবারো সেই ‘ টারমিনেটর’ এর মতই জেগে উঠেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকা ও নব নব উদ্যমে এগিয়ে যাওয়াই যেন জাপানি জাতির বৈশিষ্ট্য।
জাপানের নতুন উত্থান পর্ব :
২০১৪ সালে প্রথমবার যখন আমি হিরোশিমায় যাই তখন এই শহরকে দেখে অবাক হই। জাপান কত সহজে ও কত দ্রুত জাগতে পারে তার একটি উদাহরণ হনশু দ্বীপের এই হিরোশিমা। হিরোশিমায় আজ আবারো সুরম্য অট্টালিকা, নান্দনিক স্থাপত্য, আধুনিক নগর অবকাঠামো, বাগান ও পার্ক। পার্কের এক পাশে মেমোরিয়াল হল। এই হলে সংরক্ষণ করা হয়েছে সেই সময়কার কিছু পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্র। বড় হলের একটি রুমে ঢুকতেই মাথার ওপর চোখ আটকে গেল। শিহরিত হয়ে উঠলাম। এটি সেই এটম বোমার ডেমো কপি। দর্শনার্থীরা কৌতুহল ভরে দেখছে। সংরক্ষিত স্থানটির একপাশে পাথরের বেদিমূলে দর্শনার্থীরা ফুল দেয়, কেউ মোমবাতি জ্বালায়।
ধ্বংসস্তুপের কেন্দ্র গ্রাউন্ড জিরোতে দাঁড়িয়ে আছে পুরানো বিল্ডিং স্থাপনা জেনবাকু গম্বুজ (Genbaku Dome)। শুধু এই বিল্ডিংটা ছাড়া প্রায় পুরো শহর মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে এটির চারপাশে গড়ে উঠেছে পিস মেমোরিয়াল পার্ক। পার্কের চারপাশের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে যখন হাঁটছি তখন শুধু অবাকই হচ্ছি। একসময় এখানে এই সবুজঘাস ছিল না, ছিল বোমার বিকট শব্দ, মানুষের গগনবিদারী আর্তচিৎকার, আগুনের লেলিহান শিখায় এখানে পরিনত হয়েছিল ছাই ভস্ম শ্মশানের প্রেতপুরী। আজ এখানে সবুজ ও হলুদ পাতার মাঝে লাল, নীল, বেগুনি রঙের হরেক রকমের ফুল ফুটে আছে। সাত ভাই চম্পার মত শত সহস্র নিহত মানুষের প্রানগুলো যেন বারে বারে ফুটে উঠছে ফুল হয়ে। শান্তির অঙ্গীকার নিয়ে দেশ বিদেশের হাজার লক্ষ দর্শনার্থীদের ঢল নামে এখানে। মেমোরিয়াল পার্কের সুবিশাল প্রাঙ্গণে নীরব পদচারনায় তারা অবলোকন করে যুদ্ধের কিছু নিদর্শন। শিশুদের জন্য আছে দলবেঁধে সুশৃঙ্খলভাবে দেখার ব্যবস্থা। জাপান ও বিদেশি কয়েকদল শিশু দেখলাম, তাদের হাতে দেওয়া হয়েছে শান্তির সাদা পতাকা। কারো হাতে আছে নিজ নিজ দেশের পতাকা। তাদেরকে গাইড ও শিক্ষা দিচ্ছে স্বেচ্ছাসেবকরা। বিদেশি দর্শনার্থীদের সাথে আসা শিশুরা খেলছে এই পিস মেমোরিয়াল হলের বাইরের মাঠে। তাদের ছুটাছুটিতে হিরোশিমা পেয়েছে যেন নতুন প্রাণ।
সাক্ষাতে পরিচয় হয় আন্তর্জাতিক কমিউনিটির মানুষজনের সাথে। কথা হয় অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, চীন, জার্মানি, নরওয়ে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, নেদারল্যান্ডস, ইটালী, আরব , ইন্ডিয়া থেকে আসা শান্তিকামী মানুষের সাথে। কেউ কেউ ইংরেজিতে কিংবা কেউ কেউ দোভাষীর মাধ্যমে নিজ ভাষায় বলতে চাইছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য এটম বোমার মত ভয়াবহ হামলার প্রয়োজন ছিল না। এটা ছিল মানব ইতিহাসের যুদ্ধে সবচেয়ে বর্বরোচিত হত্যাকান্ড। তখন জাপানিরা বেপরোয়া ও আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু সেসব কিছুই যেন ম্লান করে দেয় হিরোশিমা ও নাগাসাকির উপর এটম বোমা মারণাস্ত্রের এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
জাপানিদের মনে এখনো সেই দুঃখ, ক্ষোভ, রাগ আর অভিমান। সেই ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন এখনো তাদেরকে তাড়া করে বেড়ায়। প্রতিশোধের আগুন এখনো তাদের মনের গভীরে। কিন্তু সেই আগুনকে তারা কাজে লাগাচ্ছে সৃজনশীলতা, নির্মাণ, কর্ম উদ্দীপনা, উৎপাদন আর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায়। জাপানিরা এমন একটা জাতি যারা নিত্য ভূমিকম্প, ঝড়, তুফান, সুনামি, প্রাকৃতিক জলোচ্ছ্বাস ও দূর্যোগের মত শত প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে চলে। তাই মানবসৃষ্ট বোমার আঘাত তাদেরকে ক্ষত বিক্ষত করলেও তাদের রয়েছে নতুনভাবে জেগে উঠার জাতিগত শক্তি ও সাহস। যুদ্ধের বিপরীতে শান্তির শপথে অগ্রসরমান জাপান আজ অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক শক্তি। এক সময়কার প্রশান্ত মহাসাগরের ত্রাস ও সামরিক শক্তি জাপান আজ গড়ে তুলছে আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সোপান।
পার্ল হারবারে আক্রমণ করে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে দেশকে জড়িয়ে ফেলেছিল সেই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রই আজ জাপানের বড় কৌশলগত মিত্র। এটি জাপানের আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির বড় সাফল্য। কারন যুদ্ধের পর জাপানের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল আমেরিকার সাথে যুদ্ধনীতিতে নয়, বরং তার বিশাল অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগানো। এতে জাপান সফল। তার অর্থনৈতিক কূটনীতি আজ পুরো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া হতে ওশেনিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। আজ বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশসমূহের জোট জি-এইট এর একমাত্র এশীয় সদস্য জাপান। এবার সে গড়ে তুলছে The Bay of Bengal Industrial Growth Belt( BIG B). এই পরিকল্পনায় জাপান তার এই মহাজাগরণে উন্নয়ন অংশীদার করছে বঙ্গোপসাগরীয় দেশ ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা সহ আরো কয়েকটি দেশকে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে চলছে এই উন্নয়ন নেটওয়ার্কের কর্মযজ্ঞ। হচ্ছে বৃহত্তর যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ।
পেছনে ফিরে তাকিয়ে জাপানিরা হিরোশিমার ধ্বংসযজ্ঞ স্মরণ করে ঠিকই, কিন্তু তারা চলে আগামীর পথে। তাদের মেধা ও মননে কাজ করে ফিনিক্স পাখীর মত উড়ে গিয়ে নব সৃষ্টি ও কর্ম উন্মাদনায় মেতে উঠা। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জে পবিত্র পর্বতমালা মাউন্ট ফুজিকে বুকে ধারণ করে সাদা পতাকার মাঝে লাল টুকটুকে উদীয়মান সূর্য যুগে যুগে সেই শক্তিই যুগিয়ে যাচ্ছে জাপানকে।
……………..
( হিরোশিমা দিবস উপলক্ষে লিখিত)।
………. সরোয়ার আমিন বাবু।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক।
চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরাম(সিআরএফ)।
ও সদস্য, এওটিএস ( জাপানের আন্তর্জাতিক কোঅপারেশন উন্নয়ন সংস্থা)।
























