কমিউনিটির জীবনমান উন্নয়ন / নিউজ ডেস্ক :
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা International Renewable Energy Agency ( IRENA)এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে মোট বিদ্যুতের ৭২% হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি । এর মধ্যে ৩৫% আসবে সৌরবিদ্যুৎ (সোলার) থেকে, ২৪% বায়ু বিদ্যুৎ (উইন্ড মিল) ও ১২.৫% আসবে পানি বিদ্যুৎ (হাইড্রো ইলেকট্রিক) থেকে। এছাড়াও আসবে জৈব গ্যাস ( বায়োমাস), ভূ-তাপ( জিওথার্মাল), সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস (টাইডাল) ও হাইড্রোজেন প্রযুক্তি থেকে। কয়লা ও জ্বালানি কাঠের ব্যবহার কমে আসবে অনেক। উৎপাদন জটিলতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিবেশ দূষণের কারনে এসব গুরুত্বও হারাবে।
ইতোমধ্যে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে সারা বিশ্ব এখন সোচ্চার। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকার প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে প্রত্যবর্তনে নতুন গতি পেয়েছে জ্বালানি সহ পরিবেশ বান্ধব কর্মসূচীগুলো। একদিকে এশিয়ায় জাপান, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মত উন্নত দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। চীন ও ভারতের মত বড় জনসংখ্যার দেশগুলোও কয়লা ভিত্তিক জ্বালানি থেকে সরে আসছে। নতুন জ্বালানি সেক্টরে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
তবে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ ও দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এগিয়ে রয়েছে ভারত। বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী এই দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশ্বে রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে। এমনকি নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে বায়ুশক্তি ও সোলার থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে ভারত এখন পঞ্চম অবস্থানে।চলতি বছরও নবায়নযোগ্য খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।
বাংলাদেশ প্রেক্ষিত:
বাংলাদেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভারতের আবহাওয়ার সাথে বাংলাদেশের আবহাওয়া অনেকটা মিল থাকায় এখানেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন আমাদের অনুকূলে। সেখানে তারা যেভাবে বড় বড় সোলার পার্ক স্থাপন করেছে তা এদেশও করা যায়। ভারতের মত প্রচুর না হলেও পর্যাপ্ত সূর্যের আলো এদেশে বিদ্যমান। তাছাড়া বিশাল সমুদ্র সীমা অর্জন করায় আমাদের উপকূলীয় এলাকায় সোলার পাওয়ার ও বায়ু বিদ্যুৎ(উইন্ড মিল) এর পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির টাইডাল ও পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরী হয়েছে। এজন্য আমাদের জনবল ও প্রযুক্তিও রয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের তাগিদে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার কমানোরও জোর দাবি উঠছে বিশ্বব্যাপী।এমনকি এই জ্বালানি সেক্টরটিতে বিনিয়োগে এখন অনিচ্ছুক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোও। জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate change)প্রভাব থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় আনা হচ্ছে সরকারী নীতি নির্ধারনী সভায় । বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সম্প্রতি এক ওয়েবিনারে বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে কীভাবে সরে আসা যায়, সরকার এখন সে বিষয়
বিবেচনা করছে। বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা ও ব্যবহার বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশেও। ব্যক্তি ও বিভিন্ন কোম্পানিগুলো বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে সোলার পাওয়ারে তাদের আগ্রহ বেশী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পরিবেশ গবেষক চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফজলুর রহমান বলেন, পরিবেশ বাঁচাতে এখন বেশি করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন এবং ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর। তবে আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অধিকতর টেকসই ও গণমুখী করা যায়নি এখনো। সৌর জ্বালানি এখনো অবধি গণহারে ব্যবহার উপযোগী নয়। কেবল সীমিত ও খন্ডিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সব নবায়নযোগ্য জ্বালানি। তাই এখাতে আরো ব্যাপক কাজ করার আছে। আমরা দিন দিন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপদের বেড়াজালে বন্দী হয়ে যাচ্ছি৷ এখন টেকসই ও গণমুখী নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
রোডম্যাপ ও পরিকল্পনা কি? :
‘টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি রোডম্যাপ ও খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে তা জমা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ।খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ২০৩০ সালের মধ্যে ৮৭৪৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব । এরমধ্যে রুফটপ সোলার, মিনিগ্রিড, সোলার হোম সিস্টেমসহ অন্যান্য উৎস থেকে আসবে প্রায় ৫৫০০ মেগাওয়াট। এতে আরো বলা হয় দেশের অনুকূল বিনিয়োগ প্রক্রিয়া ও চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের
মধ্যে শুধু সোলার থেকেই ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। সোলার প্রযুক্তির খরচ কমে আসায় অনেকে এ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।
ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হওয়া শুরু হয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফে নাফ নদীর তীরে ১১৬ একর জমিতে কার্যক্রম শুরু করেছে টেকনাফ সোলারটেক এনার্জি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিনই ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে। ময়মনসিংহেও ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প উৎপাদনে যাবে শীঘ্রই । এছাড়াও দেশব্যাপী আরো ২০টিরও বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে বলে জানা যায়।
পরিকল্পনায় সোলার থেকে বিদ্যুৎ পেতে দেশের মোট ১৪টি জেলা ও অঞ্চলকে প্রাথমিকভাবে
বাছাই করা হয়েছে। এছাড়াও পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার চরাঞ্চলকে সোলার প্লান্ট স্থাপনে কাজে লাগানো হবে।
স্থানীয় কমিউনিটির কর্মসংস্থান :
IRENA গবেষনা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান বাড়বে এবং সারাদেশ উপকৃত হবে। গত বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে , এই সেক্টরে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। মোট ১৬১ দেশের মধ্যে এ সেক্টরে কর্মসংস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম। জনসংখ্যা অনুপাতে শীর্ষস্থানে এখনো চীন। যেহেতু প্রকল্পগুলো হয় সাধারণত প্রান্তিক ও উপকূলীয় এলাকার, তাই কর্মসংস্থান ও সংশ্লিষ্ট লজিস্টিক ব্যবসা সহ বিভিন্নভাবে সবচেয়ে বেশী উপকৃত হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
জলবায়ু পরিবর্তনে ভুক্তভোগী দেশ:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন ক্লাইমেট চেইঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তনে ভুক্তভোগী দেশগুলো এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে জ্বালানি সহ পরিবেশ বান্ধব সবুজ কর্মসূচীগুলো বাস্তবায়ন করার। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তাই সারা বিশ্বের মতো আমাদেরও ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের ওপর নজর দেওয়া উচিত। আগামীতে জ্বালানি শক্তি আহরণের পুরো চিত্রই পাল্টে যাবে। পরিবহন সেক্টরে আসবে বিদ্যুৎ চালিত গাড়ী। এসব গাড়ির জন্য প্রয়োজন হবে আরো বিদ্যুৎ। এতে ব্যবসায়ীরাও নতুন প্লান্ট স্থাপন বিনিয়োগে আকৃষ্ট হচ্ছেন। এখন সারা বিশ্বেই চাহিদা বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জির। হচ্ছে বিভিন্ন রকমের সোলার পার্ক। কোস্টাল বেল্ট(উপকূলীয় এলাকা), দ্বীপ, পাহাড়ী জনপদে সোলার ও উইন্ডমিল স্থাপনে সারা বিশ্বে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশরও এর থেকে বাইরে থাকার সুযোগ নেই।
…..স্পেশাল রিপোর্ট। সরোয়ার আমিন বাবু।























