
“বিদ্যুৎ ছাড়া কোন কাজ হয় না , কিন্তু দেশের জনসংখ্যার শতকরা ১৫ ভাগ লোক যে শহরের অধিবাসী সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকিলেও শতকরা ৮৫ জনের বাসস্থান গ্রামে বিদ্যুৎ নাই। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করিতে হইবে। ইহার ফলে গ্রাম বাংলার সর্বক্ষেত্রে উন্নতি হইবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ চালু করিতে পারিলে কয়েক বছরের মধ্যে আর বিদেশ হইতে খাদ্য আমদানী করিতে হইবে না।”
—-জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
গ্রামীণ অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক চিন্তাধারার প্রধানতম দিক হলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জন ও জনগণের সার্বিক কল্যাণ সাধন। এ লক্ষ্যে তিনি সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন বাধ্যতামূলক বহুমুখি গ্রাম-সমবায় প্রকল্পের ভিত্তিতে। এক্ষণে সঙ্গতকারণেই আমাদেরকে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পটভূমিকা সম্পর্কে কিছু ধারণা নিতে হবে, নইলে আমাদের অনেক কিছুই বুঝতে কষ্ট হবে।
বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের অর্থনীতি তাই মূলত: কৃষিনির্ভর দেশ। আর গ্রামবাংলাই হলো কৃষি অর্থনীতির মূল ক্ষেত্র। তাই গ্রামবাংলার সার্বিক উন্নয়নের উপরই বাংলাদেশের সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন নির্ভর করে।
গ্রামীন উন্নয়ন বলতে গ্রামীন জনপদের উন্নয়ন বলা হয়। আর গ্রাম বাংলার জনপদ যদি বলা হয় তবে তা কৃষক আর কৃষির সাথে নিবিড়ভাবে জরিত। কারণ শতকরা ৮০-৯০ভাগ গ্রামীন জনগোষ্ঠি কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত। তাই কৃষির বিপ্লব মানে হল গ্রামীণ জনপদের উন্নয়ন।
আধুনিক প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এখন সবকিছুই যন্ত্রের মাধ্যমে হচ্ছে। চাষাবাদ, বীজ বপন, নিড়ানি, সার দেয়া, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়া ও প্যাকেটিং পর্যন্ত সবই হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে। কৃষির যান্ত্রিকীকরণের ফলে একদিকে যেমন উৎপাদনের পরিমান বাড়ছে অন্যদিকে তেমনি উৎপাদন ব্যয় কমছে। একই সঙ্গে ফসলের অপচয়ও কমছে। দেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন খাদ্যশস্যের বার্ষিক উৎপাদন ছিল দেড় কোটি টনের মতো। এখন খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন কোটি টনের বেশী। এই সময়ে জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি থেকে বেড়ে ১৬ কোটিরও বেশী হয়েছে। আবাদী জমির পরিমাণ কমেছে অর্ধেকের বেশী। লক্ষ্য করার বিষয়, আবাদী জমি এত ব্যাপকহারে কমার পরও খাদ্যশস্যের উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, যাতে ১৬ কোটিরও বেশী মানুষের খাদ্যসংস্থান হচ্ছে। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার একেবারে কাছাকাছি এসে উপনীত হয়েছে। এই সাফল্য অর্জনের পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বা করছে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি। আর এসব প্রযুক্তির বেশির ভাগই দেশে উদ্ভাবিত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইন্সটিটিউটের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের মোট আবাদী জমির ৯০-৯২ শতাংশে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। চাষাবাদের সব পর্যায়ে অর্থাৎ জমি তৈরি থেকে চাল উৎপাদন পর্যন্ত সকল পর্যায় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আওতায় এলে উৎপাদন যে আরো বৃদ্ধি পাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
আর এইসব আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কৌশল অবলম্বন করার এক অন্যতম মাধ্যম হলো বিদ্যুৎ এর ব্যবহার। বিদ্যুৎ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ আর্থ সামাজিক উন্নয়ন সহজ ও দ্রুততর হচ্ছে।
সারা দেশে শতভাগ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিতে বিদ্যুৎ খাতেও চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। বিদ্যুৎ বিভাগ ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) কর্তৃপক্ষ প্রত্যন্ত গ্রামগুলো আলোকিত করার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এতে বিদ্যুতের সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী ও গ্রাহকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কমেছে বিদ্যুতের সিস্টেম লসের হারও। এক দশক আগেও বিদ্যুতের জন্য হাহাকার করতে হতো মানুষকে। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহে বিশাল ঘাটতি থাকার কারণেই এমনটি হয়েছিল। কিন্তু এক দশক পর ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ এই স্লোগানে উজ্জীবিত হয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিদ্যুৎ খাতের দৃশ্যপট আমূল বদলে দিয়েছে। এখন শুধু শহরাঞ্চলেই নয়, বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদও। বিদ্যুতের জাদুর ছোঁয়ায় চাঙ্গা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যে, বর্তমানে দেশের ৯৫ ভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছে। আর শতভাগ জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যুৎ প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশের আর ২২ লাখ ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে হবে।
জানা যায়, গত ১১ বছরে ২ কোটি ৪৩ লাখ নতুন গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছে। আর সেচ সংযোগ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৬৪ হাজার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে বর্তমানে ৬০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বেড়েছে বিদ্যুতের মাথাপিছু ব্যবহার, যা ৫১০ কিলোওয়াট ঘণ্টা। সারা দেশে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ৮০টি সমিতি। বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা তিন কোটি ৫৭ লাখ। গত এক দশকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে ৪৮ ভাগ জনগোষ্ঠী। আর দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দিতে সরকার সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে সরকার এক দশকের বেশি সময়ে ৫৮ লাখ সোলার হোম সিস্টেম বিতরণ করেছে। দেশের এক হাজার ৬৯টি গ্রামে যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে তার মধ্যে ৬২০টি গ্রামে আগামী বছরের জুনের মধ্যে সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ২০০৯ সালে দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। আর ২০১৯ সালে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা হয়েছে ২২ হাজার ৭২৭ মেগাওয়াট। দেশে এখন পর্যন্ত চলতি বছরের গত ২৯ মে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। আবার ২০০৯ সালে দেশে যেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৭টি ২০১৮ সালে যে সংখ্যা প্রায় ৫ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৩৭ টিতে। বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতের সমিতিগুলো প্রতি মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছে। আগে বিদ্যুতের মিটার পাওয়া কষ্টকর হলেও শতভাগ বিদ্যুতায়ন কর্মসূচি গ্রহণের পর এখন বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান দ্রুত ও সহজতর হয়েছে। এমনকি সৌর বিদ্যুতের কারণে এখন দুর্গম গ্রামীণ জনপদও সন্ধ্যার পর হয়ে উঠছে আলোকিত।
কৃষি, মৎস্য, পশুপালন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে ওপরে। ধান উৎপাদন বাংলাদেশ বিশ্ব চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে তৃতীয়, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ, আম উৎপাদনে সপ্তম, আলু উৎপাদনে অষ্টম ইত্যাদির কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। এই সাফল্য ধরে রাখাই যথেষ্ট হবে না, আরো বাড়াতে হবে। উদ্ভাবিত ফসলের উন্নত জাত এবং প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জে কৃতকার্য হওয়ার বিকল্প নেই। উন্নত ফসল আবাদ ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষকদের উচ্চ আগ্রহ প্রমাণিত।
গ্রামীণ জীবনে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রভাব:
বিদ্যুৎ ব্যহারের কারণে গ্রামীণ জীবনে আর্থ সামাজিক অবস্থান উন্নত হয়েছে। বিভিন্ন ধরণের সুবিধার প্রাপ্ত হচ্ছে- প্রথমত, ছেলেমেয়েদের সান্ধ্যকালীন লেখাপড়ার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে (৮৬%), চিকিৎসা খাতে সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে (৮৪%), রাতে কাজ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে (৮৪%), সেচ পাম্প ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে (৭৬%), যোগাযোগ (৭০%), চুরি, ডাকাতি ও অৎন্যান্য অপরাধের হার কমেছে (৬৯%), স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে (৬৪%), ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রসার লাভ হয়েছে (৬৪%), কম্পিউটার ব্যবহারে সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে (৪৮%), হাট-বাজারে সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে (৬১%), মৎস্য চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে (৫৮%), হাঁস-মুরগির চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে (৪৫%), স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে (৫৮%), মহিলাদের কাজের সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে (৪৮%)ইত্যাদি।
“পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৫ লক্ষ গ্রাহক সংযোগ” প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগের ফলে পল্লী এলাকার জনসাধারণ বিপুল উপকৃত হচ্ছে। পল্লী এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অতএব বর্তমান সরকার দেশের দ্রুততম অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ২০২১ সালের মধ্যে সারাদেশে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎসংযোগ পৌঁছে দেবার অঙ্গিকার রক্ষায় প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে অবদান রেখে চলেছেন।
সবশেষে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আজ-
• দুর্গম চর কিংবা পাহাড়ী বসতিতেও পৌঁছে গেছে বিদ্যুতের আলো,
• শিক্ষার বিস্তার,
• ঘটছে কৃষির সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে সম্পৃক্ত হচ্ছে মানুষ,
• ব্যাপক কর্মসংস্থানের সঙ্গে সঙ্গে আয় বাড়ছে গ্রামের মানুষের,
• ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার পথে হাঁটছে দেশ।
……… পুলক কান্তি বড়ুয়া।
প্রকৌশলী , কলামিস্ট
























