Home কমিউনিটি সানফ্লাওয়ার বা সূর্যমুখী। জনপ্রিয় হচ্ছে এখন বাংলাদেশে।

সানফ্লাওয়ার বা সূর্যমুখী। জনপ্রিয় হচ্ছে এখন বাংলাদেশে।

0

এগ্রো / নিউজ ডেস্ক :

ইউরোপ ও আমেরিকা ছাড়িয়ে সানফ্লাওয়ার বা সূর্যমুখী ফুল এখন জনপ্রিয় হচ্ছে এখন বাংলাদেশে। হচ্ছে ব্যাপক চাষ। অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত গুরুত্ব থাকায় এর প্রসার হচ্ছে, বলছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, আনোয়ারা, হাটহাজারী হতে রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, নাটোর,পাবনা,দিনাজপুর, গাজীপুর, টাংগাইল প্রভৃতি জেলাতে এর ব্যাপক চাষ হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় কৃষককের কাছে গ্রহনযোগ্য ও এর তেল স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় হচ্ছে এখন সূর্যমুখী।
সূর্যমুখী: সূর্যমুখীর বৈজ্ঞানিক নাম Helianthus annuus। ক্যারোলাস লিনিয়াস। একধরনের একবর্ষী ফুলগাছ এটা। সূর্যমুখী গাছ সাধারণত  লম্বায় ৩ মিটার (৯.৮ ফু) হয়ে থাকে, ফুলের ব্যাস ৩০ সেন্টিমিটার (১২ ইঞ্চি) পর্যন্ত হয়। এই ফুল দেখতে কিছুটা সূর্যের মত এবং সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে বলে এর নাম সূর্যমুখী।
ব্যবহার : বীজ হাঁস মুরগির খাদ্যরূপে ও তেলের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই বীজ যন্ত্রে মাড়াই করে তেল বের করা হয় ৷ তেলের উৎস হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সূর্যমুখীর ব্যাপক চাষ হয়। সমভুমি এলাকায় শীত ও বসন্তকালে, উঁচু লালমাটি এলাকায় বর্ষাকালে ও সমুদ্রকুলবর্তী এলাকায় শীতকালীন শস্য হিসাবে চাষ করা হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে সূর্যমুখী একটি তেল হিসেবে বাংলাদেশে আবাদ হচ্ছে।
সূর্যমুখীর ব্যবহার: সূর্যমুখীর বীজ পশুখাদ্য হিসেবে হাঁস মুরগিকে খাওয়ানো হয়। ঘিয়ের বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখীর তেল ব্যবহৃত হয়, যা বনস্পতি তেল নামে পরিচিত। ঘিয়ের বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখীর তেল ব্যবহৃত হয়, যা বনস্পতি তেল নামে পরিচিত। সূর্যমুখীর তেল অন্যান্য রান্নার তেল হতে ভাল এবং হৃদরোগীদের জন্য বেশ কার্যকর। এতে কোলেস্টেরলের মাত্রা অত্যন্ত কম। এছাড়া এতে ভিটামিন এ, ডি ও ই রয়েছে। ভিটামিন-ই এর উত্তম উৎস হলো এই সুর্যমুখী ফুলের বীজ। ভিটামিন-ই এর অনেক উপকারী দিক রয়েছে। ভিটামিন ‘ই’ এর ফ্রী র‌্যাডিক্যাল প্রতিরোধী বা এ্যান্টি অক্সিডেন্ট ভূমিকাই কাজ করে।  ভিটামিন ‘ই’  হৃদরোগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উপকারী ভূমিকা পালন করে। এ দুটো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রদাহ নিবারণ ও মসৃণ মাংস পেশীর কোষ প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করা। ভিটামিন ‘ই’ এর ক্যান্সাররোধী গুণাবলীও রয়েছে।
সূর্যমুখী তেল:  তেলের উৎস হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সূর্যমুখীর ব্যাপক চাষ হয়। এর তেল মানে-গুণে অনন্য। সারাবিশ্বেই এর ব্যাপক চাহিদা থেকে এদেশেও বাণিজ্যিকভাব সূর্যমুখীর চাষ শুরু হয় ষাটের দশক থেকে। এখন এর বিস্তার ঘটছে দ্রুত।
চাষের সময়: সূর্যমুখীর চাষ মূলত অগ্রহায়ণে করা হয় ভাল ফলন লাভের আশায়। সূর্যমুখীর চাষ সারা বছর করা যায়। তবে অগ্রহায়ণ মাসে চাষ করাই উপযুক্ত সময়। দেশের উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রী সে. এর নিচে হলে ১০-১২ দিন পরে বীজ বপন করতে হয়। খরিফ-১ মৌসুমে অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ (মধ্য-এপ্রিল থেকে মধ্য-মে) মাসেও এর চাষ করা যায়।
জমি তৈরি : সূর্যমুখীর জমি গভীরভাবে চাষ দিতে হয়। জমি ৪-৫ বার আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।জাত নির্বাচন: ১৯৮২ সালে জার্মপ্লাজম হতে বাছাইয়ের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয় কিরণী (ডিএস-১) জাতটি। এই জাতের গাছ ৯০-১১০ সে.মি. লম্বা হয়। বীজের ওজন হাজারপ্রতি ৬০-৬৫ গ্রাম। বীজের আকৃতি লম্বা ও চ্যাপ্টা হয় এবং কালো রঙ এর হয়। প্রতি গাছে একটি করে ফুল আসে। বীজ বপনের পর ফসল সংগ্রহ করতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। হেক্টরপ্রতি ১.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। ফসল সংগ্রহ করতে প্রায় ৯০-১০০ দিন সময় লাগে।বপন পদ্ধতি ও বীজের হার: বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্যে সূর্যমুখীর বীজ সারি সারি করে বোনা হয়। সারি ৫০৫০ ও কলামে ২৫২৫ দূরত্বে বীজ বপন করা হয়। এতে হেক্টরপ্রতি ৮-১০ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।সার প্রয়োগ: প্রতি একরে সারের আনুমানিক পরিমাণ ইউরিয়া ৪৫০-৫০০ কেজি,টিএসপি ৩৭০ কেজি, এমপি ৩০০-৩৭০ কেজি,জিপসাম ৩৫০,জিংক সালফেট ২০ কেজি,বরিক এসিড ২৫ কেজি,ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ২৩০-২৫০ কেজি।ইউরিয়া সার অর্ধেক করে  এবং বাকি সব সার শেষ চাষের সময় জমিতে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া সার দুই ভাগে দিতে হবে। প্রথম ভাগ চারা গজানোর ২০ দিন পর এবং দ্বিতীয় ভাগ ৪০ দিন পর বা ফুল ফোটার আগে আগে প্রয়োগ করতে হবে।রোগবালাই ও প্রতিকার : পাতা ঝলসানো রোগটি সূর্যমুখীর একটি বিশেষ রোগ। ছত্রাকের আক্রমণে সূর্যমুখীর এ রোগটি হয়ে থাকে। প্রথমে পাতায় ধূসর বা গাঢ় বাদামি বর্ণের দাগ পড়ে। দাগগুলো অসম আকৃতির হয়। পরে সব দাগ মিশে গিয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে। অবশেষে সম্পূর্ণ পাতা ঝলসে যায়।সূর্যমূখীর আকেটি রোগ হল শিকড় পচা রোগ। ছত্রাকের সংক্রমণে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। আক্রান্ত গাছের গোড়ায় সাদা তুলার মত ছত্রাকের মাইসেলিয়াম এবং গোলাকার দানার মত স্কেলেরোশিয়াম দেখা যায়। প্রথমে গাছ কিছুটা নেতিয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যে সমস্ত গাছ ঢলে পড়ে এবং শুকিয়ে মারা যায়। আরও পড়ুন পোকামাকড় দূর করে যেসব গাছ।

সূর্যমুখী ফুলের সৌন্দর্য :  মোহাম্মদ বেলাল নামে এক যুবক  সাতকানিয়ার একটি বাগানে  সূর্যমুখীর অসাধারণ সৌন্দর্য নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন ভোরে সূর্যমুখী বাগানের সকল গাছ অনেকটা প্যারেড দলের মতো পূর্বদিকে মুখ করে থাকে। ঐ দিকে সূর্য দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে। সূর্যের সাথে সাথে সূর্যমুখীগুলোও ধীরে ধীরে নিজেদের দিক পাল্টাতে থাকে। সূর্য যেদিকে যায় তারাও সেদিকে যায়। সবসময়ই এগুলো সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। সূর্য যখন পশ্চিম দিকে অস্ত যায় তারাও তখন পশ্চিমদিক বরাবর থাকে। অস্ত যাবার পরে তারা সারারাত ব্যাপী আবার উলটো দিকে ঘুরে পূর্বমুখী হয়। নতুন একটা দিনে আবার সূর্যের মুখোমুখি হয়। এভাবে চক্রাকারে চলতেই থাকে। বুড়িয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের এই চক্র চলতেই থাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here