কমিউনিটি হেলথ / জনস্বাস্থ্য / জনস্বার্থ / নিউজ ডেস্ক।
চট্টগ্রাম শহরের সিআরবি পলোগ্রাউন্ড রেলওয়ে এলাকায় পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে একটি বড় হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন দেশের সুশীল সমাজ ও ক্যাব। সংবাদ মিডিয়ায় পাঠানো এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, আমরা হাসপাতাল নির্মাণের বিরুদ্ধে নই,তবে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য চট্টগ্রামে অনেক পর্যাপ্ত জমি রয়েছে। সেখানে হাসপাতাল হতে পারে। কিন্তু নগরীর অক্সিজেন ভান্ডারের ফুসফুস নামে খ্যাত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সবুজ গাছপালা কেটে অপরিকল্পিত হাসপাতাল নির্মাণ মেনে নেওয়া যায় না।
বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, সম্প্রতি গণমাধ্যমের খবরের মাধ্যমে জানতে পারলাম চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিআরবি-সাতরাস্তার মোড় এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থার সাথে বহুতল হাসপাতাল নির্মাণের চুক্তি সম্পাদন করেছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। খবরটি চট্টগ্রামের আপামর মানুষকে অত্যন্ত ব্যথিত, উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ করেছে। এর কারণ বহুবিধ।
হাসপাতালে স্বভাবতই অসুস্থ মানুষদের সমাগম ঘটবে যা এলাকার পরিবেশকে প্রভাবিত করবে এবং এতে সাধারণের স্বাস্থ্য, প্রাত: ও বৈকালিক ভ্রমণ ঝুঁকি পূর্ণ হয়ে যাবে। এতে প্রবীণ নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ন হবে।
আমাদের দেশে একজন রোগিকে ঘিরে হাসপাতালে বহুজনের আগমন স্বাভাবিক ঘটনা। এতে এলাকার নির্জনতা তথা স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষুণ্ন হবে।
দেশে হাসপাতালের বর্জ্য নিষ্কাশন/ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত দক্ষতার অভাব রয়েছে। এখানেও তার পুনরাবৃত্তিরই আশংকা রয়েছে। কেননা শত প্রতিশ্রুতি ও আইনি ব্যবস্থা সত্ত্বেও এমন নজিরই দেখা যায়। এতে পুরো এলাকা ও আশেপাশের অন্তত অর্ধশত খাদ্য বিপণি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা দরকার। সিআরবি, সাত রাস্তার মোড় ও টাইগার পাস ঘিরে থাকা পাহাড় ও উপত্যকায় গাছপালার যে এলাকাটি রয়েছে তা চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসেবেই গণ্য হয়। সমুদ্রবর্তী নদীবেষ্টিত এই পাহাড়ী নগরীটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে যুগ যুগ ধরে দেশি-বিদেশি পর্যটক, ঐতিহাসিক, রাজনীতিক ও আগন্তুকদের মনোযোগ ও প্রশংসা কুড়িয়ে আসছে। এই আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র আলোচ্য নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপরূপ এলাকাটি। কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই নয় এটি ঐতিহাসিক কারণেও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ঐ এলাকায় ১৯৩০ সনের ইতিহাস-প্রসিদ্ধ চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহীরা অর্থসংগ্রহের জন্যে অভিযান চালিয়েছিল, তদুপরি সিআরবি ভবনটি দেশের ব্রিটিশ বা কলোনিয়াল স্থাপত্যের বিলীয়মান নিদর্শনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি। এটি স্থাপত্যকলা ও ইতিহাসের ছাত্র-শিক্ষকের শিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব বিবেচনা থেকেই এলাকাটিকে বাংলাদেশ সরকার সংবিধানের ২য় ভাগের ২৪ ধারা অনুযায়ী ঐতিহ্য ভবন ঘোষণা করে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে।
এখানে বলা প্রয়োজন আমরা হাসপাতাল নির্মাণের বিরোধী নই, কেবল একটি প্রাকৃতিক কারণে সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্থানে এধরনের একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ অনুচিত বলে মনে করছি। চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতালের প্রয়োজন আছে, তবে তা উপযুক্ত স্থানেই নির্মিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
এই নির্জন মনোরম এলাকাটিই চট্টগ্রামে বয়স্কদের প্রাত:ভ্রমণ, তরুণদের নাগরিক জীবনে হাঁপ ছাড়ার এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের বাৎসরিক কয়েকটি উৎসব পালনের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মনে রাখতে হবে অবকাঠামোগতভাবে দ্রুত বর্ধিষ্ণু এই নগরে রাজধানী ঢাকার মত রমনা পার্ক নেই, নেই সোহরাওয়ার্দি উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মত সবুজ-ঘেরা কোনো বড় অঞ্চল। নগরের মধ্যে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র এই একটি এলাকা।
তাই সব দিক বিবেচনা করে অবিলম্বে এই হঠকারি সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ থেকে সংশ্লিষ্টদের সরে আসার অনুরোধ জানাব আমরা। অন্যথায় নাগরিক সমাজ আরও বৃহত্তর আন্দোলন ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হবে। বিবৃতি দাতারা হলেন শহীদ জায়া বেগম মুশতারী শফী, প্রফেসর ড. অনুপম সেন, প্রফেসর ড. সিকান্দার খান, দৈনিক আজাদী সম্পাদক, এম. এ. মালেক, এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, প্রফেসর আবুল মনসুর, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান, প্রফেসর ডা. এ. কিউএম সিরাজুল ইসলাম, প্রফেসর হরিশংকর জলদাস, অধ্যাপক ফেরদৌস আরা আলীম, ডা. চন্দন দাশ, নাট্যব্যক্তিত্ব আহমেদ ইকবাল হায়দার, প্রফেসর অলক রায়, স্থপতি জেরিনা হোসেন, প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার, আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসান প্রমুখ।
এদিকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে ইউনাইটেড হাসপাতাল পরিচালনা কর্তৃপক্ষ ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে সিআরবিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ নির্মাণের চূড়ান্ত করার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম নগর ও বিভাগীয় নেতৃবৃন্দ। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, চট্টগ্রামে ব্রিটিশ আমলের চুন-সুরকির ‘সিআরবি’ বা সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং এলাকায় ভবনকে ঘিরে শতবর্ষী গাছগাছালি, পিচঢালা আঁকাবাঁকা রাস্তা, ছোট-বড় পাহাড়-টিলা আর নজরকাড়া বাংলোগুলো ঘিরে মন জুড়ানো এক প্রাকৃতিক পরিবেশ যা পুরো নগরবাসীকে শ্বাস নিতে সহায়ক হয়ে ‘ফুসফুস’ নামে খ্যাত হয়ে আছে। আর এই ফুসফুসকে ধ্বংসের অংশ হিসাবে এখানে বড়সড় হাসপাতাল নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, বন, পাহাড় ধ্বংস করে সিআরবিতে শুধু হাসপাতালই নয়, কোনো ধরনের স্থাপনাই না করার দাবি করে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও বিভিন্ন শিল্পের নামে পাহাড়, রেলওয়ের ভূমি দখলে ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র বন্ধ করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ সরকারের সংস্লিষ্ঠ মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সাথে চট্টগ্রামের ফুসফুস ও বুকভরে নিঃশ্বাস নেবার স্থানটিকে ঐতিহ্য হিসাবে সংরক্ষনের দাবি জানিয়ে অবিলম্বে এ ধরণের হটকারী সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহবান জানিয়েছেন।
সোমবার গণমাধ্যমে প্রেরিত বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন ক্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারন সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, ক্যাব মহানগরের সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, ক্যাব চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি আলহাজ্ব আবদুল মান্নান, ক্যাব যুব গ্রুপের সভাপতি চৌধুরী কে এনএম রিয়াদ প্রমুখ।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, চট্টগ্রামে ঢাকার মতো রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন না থাকলেও হাজার বছরের গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত নয়নাভিরাম এই উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিসরটি নগরীর লক্ষ লক্ষ মানুষকে সতেজ শ্বাস নিতে সহায়তা করেছে। যার কারনে সংস্কৃতি অংগন ও বিনোদনের অন্যতম তীর্থস্থানে পরিনত হয়েছে এই সিআরবি। যা চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংগে মিশে আছে। কিন্তু হাসপাতাল করার মতো চট্টগ্রামে অনেক খালি জায়গা থাকার পরও সিআরবির প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস করে হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হলো তা কোন ভাইে বোধগম্য নয়।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদেরকে শিল্প স্থাপনের নামে প্রতিনিয়তই বিপুল পরিমান সরকারি ভ‚মি, পাহাড়, স্থাপনা নামমাত্র মূল্যে বরাদ্দ দিচ্ছেন। আর নগরবাসীর এই জায়গায় পাহাড়, টিলা ও মানুষের শ্বাস নেবার স্থানটুকুও বাদ যাচ্ছে না। সিআরবি চট্টগ্রামের কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক কারখানা। হাসপাতাল করার জন্য চট্টগ্রামে অনেক জায়গা থাকলেও শতবর্ষী গাছ, পাখির কোলাহল, বসার জায়গা, হাঁটাহাঁটির পথ, প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে কংক্রিটের ভারী স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন খুবই দুঃখজনক। আর প্রকৃতি ধ্বংস করে হাসপাতাল কেন শহরের মাঝখানে স্থাপন করতে হবে, তা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মতপ্রকাশ করেন।
তাঁরা বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মানুষের বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগও ক্রমাগত ভাবেই কমে যাচ্ছে। নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংস, পাহাড় কাটা ও ধ্বংসের মহাযজ্ঞ চলছে চট্টগ্রামে। ইতিপূর্বে শিল্প স্থাপনের নামে বৃহৎ শিল্পগ্রুপ অনেকগুলি পাহাড়, প্রাকৃতিক নৈষর্গিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে। সার্কিট হাউজকে ধ্বংস করে শিশু পার্ক, সংস্কৃৃতি অংগনের ঐতিহাসিক স্থাপনা ডিসি হিল এখন আর সাংস্কৃতিক আয়োজন করা যায় না। তাই বৃহৎ শিল্পগ্রুপের কংক্রিটের আগ্রাসন রোধে এখনই সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবার আহবান জানিয়ে নগরবাসীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে স্আিরবিতে হাসপাতাল স্থাপন থেকে সরে আসার আহবান জানান।
…….. প্রেস রিলিজ।
……. ( জনস্বাস্থ্য, জনস্বার্থ ও জনকল্যাণমুলক যে কোন নিউজ, প্রেস রিলিজ ও কমিউনিটির কল্যাণ সংশ্লিষ্ট তথ্যবহুল লেখা যে কেউ পাঠাতে পারেন communitytvnews@gmail.com এই ইমেইলে।)
























