কমিউনিটি হেরিটেজ/ইতিহাস ঐতিহ্য/পরিবেশ প্রকৃতি/ স্পেশাল রিপোর্ট।
দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে যে পথ তাকেই বলা হয় পাহাড়ী মধ্যপথ বা পাহাড়ী পাস। চট্টগ্রামের টাইগারপাস পৃথিবীর অন্যতম একটি সুন্দর পাহাড়ী পাস হিসেবে স্বীকৃত। এটি যেমন সবুজ গাছপালা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত তেমনি এটির রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দুই পাহাড়ের মাঝখানে যে রাস্তা বা পাসগুলো রয়েছে সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। পাহাড়গুলোর নান্দনিক সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে কোন ধরনের অবকাঠামো ও ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয় না। পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকেই বেশী প্রাধান্য দেওয়া হয় এ ক্ষেত্রে। দুই দিকের সবুজ পাহাড় ও পাথরের পাহাড়গুলোর মাঝ দিয়ে আঁকাবাকা রাস্তাগুলো পর্যটনের জন্যও সাজানো হয় খুব সুন্দর ও পরিকল্পিতভাবে। কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশেই চট্টগ্রামের টাইগার পাসের দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। এটাকে কাণ্ডজ্ঞানহীন, অপরিকল্পিত ও হঠকারী সিদ্ধান্ত বলছেন দেশের বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী ও স্থপতিরা।
তাঁরা বলছেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(সিডিএ) কর্তৃক নির্মিতব্য এক্সপ্রেস ওয়ে নামের ফ্লাইওভারটি আগ্রাবাদ থেকে দেওয়ানহাট মোড় পর্যন্ত নামানো যথেষ্ট ও অধিক যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এটিকে টাইগারপাসের দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে লালখানবাজার মোড় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কোন মানে হয় না। ফ্লাইওভার হলে এতে ইট কংক্রিটের নীচে দুই পাহাড়ের সবুজ গাছপালা ঢাকা পড়বে। পাশাপাশি নগরীর প্রাকৃতিক ও নান্দনিক সৌন্দর্য বিনষ্ট হবে। তাছাড়া এ এলাকার যে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের যে অবয়ব ও পরিচিতি রয়েছে তা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এটা বর্তমান সরকারের পরিবেশ বান্ধব উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করবে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে এই ফ্লাইওভার নির্মাণে ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আপত্তিপত্র দেওয়া হলেও সিডিএ তাদের কাজ চালিয়ে যেতে অনড়। সিডিএ এর বক্তব্য হলো, পরিকল্পিতভাবেই ফ্লাইওভারটি করা হচ্ছে এবং এতে পাহাড় ও গাছপালার ক্ষতি হবে না।
পৃথিবীর বিভিন্ন পাহাড়ী পাস:
ইন্টারনেট ও বিভিন্ন অনলাইন তথ্যসূত্রে জানা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে পাহাড়ী পাস বা রাস্তাগুলো রয়েছে সেগুলো খুব গুরুত্ব সহকারে সংরক্ষণ করা হয়। এগুলোকে বানিজ্যিক যোগাযোগ ও পরিবেশ পর্যটন শিল্পের জন্যও উন্নত করা হয়। কিন্তু কোন ধরনের এক্সপ্রেস ওয়ে, ফ্লাইওভার ও স্থাপনা অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় না। সারা পৃথিবী জুড়ে প্রায় এক হাজারেরও অধিক পাহাড়ি পাস রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে।
যেমন, আফ্রিকা মহাদেশে মিশরের বিখ্যাত হালফায়া পাস, মরক্কোর টিজি এন টিকা পাস, দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ পাস, ওয়েস্টার্ন কেপ পাস।
এশিয়া মহাদেশে হিন্দুকুশ পর্বতমালার পাদদেশে আফগানিস্তানের কাবুলে সালাং পাস, কাজাকিস্তানের কাছে চীনের অলাটো পাস, ভারতের কাছে ডংকালা পাস, ভারতের কারাকোরাম পাস, মধ্যপ্রদেশের অসিরগর পাস, উত্তরখন্ডে কালিন্দী পাস, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের খাইবার পাস, তুরস্কের জিগানা পাস, জাপানের উসুই পাস।
পাহাড়ী রাস্তা বা পাসগুলোকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয় আল্পস পর্বতমালার পাদদেশ ইউরোপে, বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডে। পাহাড়ী পাসগুলো সুইজারল্যান্ডে করেছে অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত। এখানে রয়েছে শতাধিক পাহাড়ী পাস। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বার্নিনা পাস ও জুলিয়ার পাস। ফ্রান্সে রয়েছে কল ডি টেন্ডে পাস ও বিজরফিজেল পাস।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য হলো মধ্য ক্যালিফোর্নিয়ার পাচিকো পাস, ওয়াশিংটনের অস্টিন পাস ও গ্রিন পাস। দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডরের পাপালেক্টা পাস, আর্জেন্টিনা ও চিলির পাসো রোবালো। অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে পিচি রিচি পাস ও আর্থার পাস।
বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি পাহাড়ী পাস থাকলেও চট্টগ্রামে রয়েছে শুধুমাত্র একটি এই টাইগার পাস। কিন্তু সেটিকেও ঢেকে দেওয়া হচ্ছে নগর যোগাযোগ উন্নয়নের নামে ফ্লাইওভার দিয়ে।
এ বিষয়ে দেশের বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো নির্মাণে বিদ্যমান ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়। এটা আর্কিটেক্ট ডিজাইন ও ল্যান্ডস্কেপিং এর গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাছাড়া সঠিকভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডিও করা হয়। কিন্তু টাইগারপাসের উপর দিয়ে লালখান বাজার পর্যন্ত যে ফ্লাইওভার হচ্ছে সেটাতে সঠিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়েছে কি না তা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারন এখানে নান্দনিক সবুজ পাহাড় ও প্রচুর গাছপালা ঢাকা পড়বে। এটার ডিজাইন মডিফাই করা উচিত।
এদিকে টাইগারপাসের ঐতিহ্য ও সবুজ পাহাড়ী পরিবেশ রক্ষায় ইতোমধ্যে সোচ্চার হয়েছে চট্টগ্রাম ঐতিহ্য রক্ষা পরিষদ, আমরা চট্টগ্রামবাসী সহ বেশ কয়েকটি সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন। তারা ইতোমধ্যে টাইগারপাস এলাকায় মানববন্ধন সহ আলোচনা সভা ও সেমিনারও করেছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রাম ঐতিহ্য রক্ষা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা চাই এয়ারপোর্ট থেকে দ্রুত যাতায়াতের জন্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্লাইওভার হউক। কিন্তু সেটা দেওয়ানহাট পর্যন্ত যথেষ্ট। দেওয়ানহাট মোড় থেকে কালীবাড়ি মন্দিরের সামনে দিয়ে পুরোনো রাস্তার উপরে ফ্লাইওভারটি নামিয়ে টাইগারপাস মোড়ে নামানো যায়। এতে সরকারি অর্থ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। তাছাড়া নির্মাণ জটিলতাও কমে যাবে এবং টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত পাহাড়ী সৌন্দর্য, গাছপালা ও ঐতিহ্য রক্ষা পাবে।
এ বিষয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, চুয়েটের প্রকৌশলী দিয়ে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। এর নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। পাহাড়কে অক্ষত রেখেই টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত এক্সপ্রেস ওয়ে সংযুক্ত করা হবে। এতে এ এলাকার সৌন্দর্য আরো বহুগুণ বেড়ে যাবে।
তবে বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ পরিকল্পিত ফোরাম চট্টগ্রাম এর প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া ভিন্নমত দিয়ে বলেন, ফিজিবিলিটি স্টাডি সঠিকভাবে করা হয়েছে কি না তাও প্রশ্ন সাপেক্ষ ব্যাপার। তিনি আরো বলেন, আমরাও চাই চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। কিন্তু এই উন্নয়ন যেন হয় পরিবেশবান্ধব। পতেঙ্গা থেকে সাড়ে ষোল কিলোমিটার পাড়ি দেওয়া এক্সপ্রেসওয়েটি খুব সহজেই দেওয়ানহাট ল্যান্ডিং পয়েন্ট করে বিদ্যমান দেওয়ানহাট ব্রীজের পাশাপাশি আরেকটি ব্রীজ করে তা টাইগারপাস মোড়ে সংযুক্ত করা যায়। দুইদিকের পাহাড় অক্ষত রেখে টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত রাস্তাটি ছয় লেইন করা যায়।
এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীও টাইগারপাসের পাহাড় রক্ষা করার জন্য এক্সপ্রেসওয়েটি দেওয়ানহাট মোড় পর্যন্ত করার জন্য সিডিএর কাছে একটি সুপারিশ পত্র পাঠিয়েছেন। চট্টগ্রাম ঐতিহ্য পরিষদের দেওয়া স্মারকলিপির উপর ভিত্তি করে নির্মিতব্য এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সিডিএ বরাবরে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে।
……… স্পেশাল রিপোর্ট।
সরোয়ার আমিন বাবু।























