বিশেষ প্রতিনিধি : কক্সবাজারের মহেশখালী মাতারবাড়ী দ্বীপে গভীর সমুদ্র বন্দর হলে পাল্টে যাবে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর(কমিউনিটি) জীবন জীবিকা। শিল্প ও বানিজ্য নির্ভর কর্মশক্তি গড়ে উঠে স্থানীয় মানুষদের মাঝে বাড়বে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য। মহেশখালীর গতানুগতিক জেলেপাড়ার রুপান্তর ঘটবে আধুনিক বন্দর কেন্দ্রীক সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমিতে। ২০২৬ সাল নাগাদ শেষ হবে বাংলাদেশের এই প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কাজ। এখান থেকে ফিডার ভ্যাসেল বা ছোট ছোট জাহাজে পণ্যের কনটেইনার চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা বন্দরে আসা যাওয়া করবে। এতে সমুদ্র উপকূল জুড়ে সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য। আরো জানা যায়, ট্রানজিট সুবিধায় যুক্ত হবে ভারতের ‘ল্যান্ডলক’ এরিয়া বা সেভেন সিস্টার্স নামে খ্যাত আসাম, অরুণাচল, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরাম ও ত্রিপুরা। সাথে নেপাল, ভুটানে চলে যাবে কনটেইনার বা আমদানি পণ্য। শুধু তাই নয়, সিঙ্গাপুরের চেয়ে কম দূরত্বের মধ্যে মাতারবাড়ী বন্দর হওয়ায় এর সুবিধা পাবে ভারতের কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর। ফলে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে এর সুফল পাবে প্রতিবেশী রাস্ট্রের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী । জানা যায়, বঙ্গোপসাগরকে নিয়ে জাপানের বিগ-বি(Bay of Bengal Industrial Growth Belt) মহা উদ্যোগের এই উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার নাম Moheshkhali Matarbari Integrated Infrastructure Development Initiative (MIDI)। সমুদ্র উপকূল জুড়ে এই বিশাল কর্ম উদ্যোগের প্রধান দিক হল এই গভীর সমুদ্র বন্দর। যদিও এটির কাজ চলছে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি(২০ ডিসেম্বর) নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রাম বন্দরের উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, মাতারবাড়ী আলাদা কোন বন্দর নয়, এটি হবে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি সম্প্রসারিত অংশ গভীর সমুদ্র বন্দর। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দরের কাজের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে, স্থানীয় মানুষজনের জীবনমান বাড়বে। দেশের উন্নয়নে তখন চট্টগ্রাম বন্দর আরো বেশী ভূমিকা রাখবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশব্যাপী যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে তার একটি বড় উদাহরণ এই গভীর সমুদ্র বন্দর। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে যেখানে পরিবর্তন হবে লক্ষ মানুষের ভাগ্য। বন্দর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেরিটাইম ওয়ার্ল্ড এর নতুন গন্তব্য বা ডেসটিনেশন হতে যাচ্ছে এই বন্দর । ১৪ মিটারের বেশি ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশ) জাহাজ ভিড়ানোর এই গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে গড়ে উঠবে আমদানি রফতানি, সি এন্ড এফ, ট্রান্সপোর্ট, রেল, বিমান সহ নতুন নতুন লিংকেজ বানিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠান। হবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। ব্যাংকিং, যোগাযোগ ও শিপিং খাতের উন্নয়ন সহ বাংলাদেশ পাবে ট্রানজিট ফিসহ বিভিন্ন খাতে রাজস্ব। স্থানীয় কমিউনিটির জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি গড়ে উঠবে শিক্ষিত, কর্মক্ষম, কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন নতুন নতুন দক্ষ জনশক্তি। আরো হবে ছোট বড় শিল্পায়ন ও নতুন উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ। সড়ক,রেল,নৌ ও আকাশ পথে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে হবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দর সংশ্লিষ্ট সংগঠন বাংলাদেশ সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি আলতাফ হোসেন বাচ্চু বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর সম্প্রসারিত হওয়া মানে সিএন্ডএফ কাজের পরিধি ও বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসা বানিজ্য বৃদ্ধি পাওয়া। অনেক বড় হবে আমদানী রফতানির এই সেক্টর। যেখানে সম্পৃক্ত হবে অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম। আন্তর্জাতিক বানিজ্যে লেনদেন, ব্যাংকিং, শিপিং বানিজ্য বাড়বে। সমৃদ্ধির মহা দুয়ার খুলে দিবে এই মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর আয়তন ৩৬২.১৮ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা ৩ লক্ষাধিক। এখানকার অধিকাংশ অধিবাসী মৎস্য, কৃষি, লবন, বনজ ও পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, গভীর সমুদ্র বন্দর এখানকার জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকায় সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। আসবে ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন। এই বন্দর কেন্দ্রিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সুফল পাবে মহেশখালীর পার্শ্ববর্তী দ্বীপ কুতুবদিয়াও। কারন মহেশখালী ও কুতুবদিয়া দ্বীপ নিয়ে একটি সংসদীয় আসন (কক্সবাজার -২) । শুধু তাই নয়, মহেশখালী চ্যানেল দিয়ে কক্সবাজার শহরের দিনে রাতে নৌপথে মানুষের যাতায়াত থাকায় নির্মিতব্য বন্দরের বেশী সুফল পাবে কক্সবাজারের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। কক্সবাজারের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২৯৮৮৪৭৩ জন। আগামী কয়েকবছরের মধ্যে ২০২৬ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩২ লাখের উপরে। পেশাগত কাজে চট্টগ্রাম শহরে অবস্থান করেন মহেশখালীর সন্তান বিশিষ্ট গণমাধ্যমকর্মী ওচমান জাহাঙ্গীর বলেন, শুধু মহেশখালী কুতুবদিয়া নয়, গভীর সমুদ্র বন্দরের সুফল পাবে আশেপাশে চকরিয়া, পেকুয়া হতে শুরু করে সারা কক্সবাজার । তাছাড়া কক্সবাজার যেহেতু বৃহত্তর চট্টগ্রামেরই অংশ এবং মহেশখালী বন্দরটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই এর সুফল পাবে পুরো বৃহত্তর চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, সমুদ্র কেন্দ্রীক অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী জড়িয়ে যোগ হবে নতুন মাত্রা। এর সাথে যোগ হবে পর্যটন শিল্প,হোটেল ব্যবসায়ী, মৎস্যজীবি, বোট চালক, লবন ও খাদ্য ব্যবসার সাথে জড়িত অনেক ছোট বড় জনগোষ্ঠী। জানা যায়, জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা এই গভীর সমুদ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সম্প্রতি(২৪ ডিসেম্বর) ঢাকার এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, থার্ড টার্মিনাল, মেট্রোরেল প্রকল্প ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ উন্নয়নে অনেকদূর এগিয়ে যাবে। বিশেষ করে, সমুদ্র যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

সাংবাদিক ও উন্নয়ন কর্মী।
























