শাহ পরীর দ্বীপবাসীদের জন্য, তাঁদের উদ্যোাগে এলাকাটিকে একটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শহর হিসাবে গড়ে তোলার প্রস্তাব করছি । সমুদ্র-সম্পদে সমৃদ্ধ এ জায়গা যথাযথতাবে সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের জন্য আকাঙ্খিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন-গঠনের ও জীবন-যাপনের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এজন্য এলাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিতভাবে লক্ষ্য স্থির করতে ও তা অর্জনের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা প্রচেষ্টা করতে হবে।
বর্তমানে এলাকাটি ঘিরে সামুদ্রিক জোয়ার হতে রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি( ডিসেম্বর ২০২০) প্রায় দুমাস আগে আমি ও আরও কয়েকজন পিকআপে করে বাঁধ নির্মাণের কর্মযজ্ঞ নিজেরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। বাঁধ নির্মিত হচ্ছে কেবল মাটি দিয়ে, মজবুত করার জন্য কোনপ্রকার কাকর বা পাথর ছাড়া। বাধের মাটিকে ঘনবিন্যস্ত ও মজবুত করার জন্য কমপ্যাক্ট রোলারও ব্যবহৃত হচ্ছে না। আর সমুদ্রের দিকটিতে বাঁধের নিরাপত্তার জন্য বিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে কংক্রিটের চৌকো ব্লক (আনুমানিক আঠারে ইঞ্চি মাপের)। জোর টাইডাল সার্জের সময় এগুলি মোটেই নিরাপত্তা দিতে পারবে না। নিরাপত্তার জন্য পঞ্চাশ টন বা তদুর্ধ আকারের টেট্রাপড দিয়ে বেষ্টনী নির্মাণ করা আবশ্যক। স্থানীয় জনগণ ও তাদের নেতৃবৃন্দকে বিষয়টি সবিশেষ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে ও অবিলম্বে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাঁধের উচ্চতা অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার সময়কার জোয়ারের সময়ের সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে দশ মিটার বা তারও বেশি হওয়া দরকার। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের ক্রমবৃদ্ধিমান উচ্চতার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় রাখা বাঞ্চনীয়। বাঁধ পুনঃপুন নির্মাণ করা বা উচ্চতা বাড়ানো ব্যয় সাধ্য কাজ। আর সামুদ্রিক জলোচ্ছাস থেকে জনগণের জানমাল রক্ষা করতে সক্ষম বাঁধই নির্মাণ করতে হবে, অন্যথায় বাঁধ নির্মাণ অনর্থক হয়ে যাবে।
বাঁধের অভ্যন্তরে জনসাধারণের বসতভিটা, বাজার, দোকানপাট ও অন্যান্য জমিজমা বাঁধের উপরিভাগ হতে অনেক নীচুতে রয়েছে। এটি বিপদজনক। এই এলাকার সকল জমি ভরাট করে এলাকাটির উচ্চতা বাঁধের উপরিতল হতে অন্তত দুই মিটার উচু করে নিতে হবে। সুষ্ঠু জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। সাথে সাথে দূষিত পানি ও বর্জ্য যাতে সমুদ্রে নিষ্কাশিত না হয় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। দূষিত পানির জন্য শোধনাগর ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ইনসিনারেটর স্থাপন করা যাবে। বাধের দুই পাশে উপযোগী ফলের গাছ ও রাতের বেলার জন্য সোলার-লাইটের ব্যবস্থা করা দরকার হবে। বাধের বাইরের অংশে উন্নত মানের ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন উইন্ডমিল স্থাপন করে বিদ্যুতের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। অধিকন্তু এলাকার বাণিজ্যিক প্রয়োজনে জেটি নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাদিও ভবিষ্যতে সম্পন্ন করার প্রয়োজন হবে।
এ কাজগুলি এগিয়ে নেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাগণকে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির ধরন ও রূপরেখা বিষয়ে আলাপ-আলােচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কর্মসূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কীভাবে জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সম্পৃক্ত করা যায় তার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
নবগঠিত সংগঠনের কাজের মধ্যে অন্যতম প্রধান কাজ হবে সমুদ্র-সম্পদকে অবলম্বন করে জনগণের আর্থিক সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধির জন্য শিল্পোদ্যোগ প্রহণ করা। সমুদ্রের লবণাক্ত জলকে ইলেট্রোলাইসিসের মাধ্যমে বিশ্লেষিত করে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করা। অবশিষ্টাংশ হতে লবণ, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রক্রিয়াজাত করা যাবে। বায়ুবিদ্যুৎ হবে শক্তি ও জ্বালানির উৎস। লবণ থেকে কস্টিক সোডাসহ বহুবিধ রাসায়নিক দ্রব্যাদি প্রক্রিয়াজাত করা যাবে। মৎস্য সহ অন্যান্য খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কারখানা, বিশেষায়িত পর্যটন ইত্যাদি নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য দ্বারা সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভবিষ্যতে এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।
সমৃদ্ধির সম্ভাবনাগুলিকে বাস্তবায়নের জন্য বিজ্ঞান শিক্ষিত ও প্রযুক্তিবিদ্যায় দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। এজন্য এখন থেকেই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এলাকায় জনগণের সহাযোগীতায় এমন একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবিলম্বে গড়ে তুলতে হবে। এটির নাম শাহ পরীর দ্বীপ স্টিম ইনস্টিটিউট রাখা যেতে পারে। তাত্ত্বিক ও হাতে কলমে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টস, গণিত ও নেতৃত্ব শেখানাের আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে এটি। শিল্পকারখানায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ জনগণের জন্য নিকটস্থ এলাকাতেই সুপরিকল্পিত ও উন্নত বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সুপেয় জল, খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ, খেলাধুলা এবং স্বাস্থ্যসেবার যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের জন্য সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও থাকতে হবে।
সর্বসাধারণের জন্য সুপরিকল্পিত ও যথাযথ মানবাহন ও রাস্তা থাকতে হবে। মটরগাড়ি, সাইকেল, পায়ে হাঁটার জন্য পৃথক ও প্রশস্ত রাস্তার সুবন্দোবস্ত করা হবে। সমন্বিত বৈদ্যুতিক সিগনালিং সহযোগে শিশু-কিশোর, ছাত্রছাত্রী ও সর্বসাধারণের জন্য নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা হবে শাহ পরীর স্বীপের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
শিক্ষাদীক্ষায়, আচার-আচরণে, দুর্নীতিমুক্ত শাসন ও ব্যবস্থাপনায় শাহ পরীর দ্বীপ হবে শান্তি ও সমৃদ্ধির আবাসস্থল। শাহ পরীর দ্বীপের সকল অধিবাসীকে এজন্য ধৈর্যসহকারে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সাথে একান্ত নিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। অবশ্যই সকলকে সম্মিলিতভাবে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কাজ করতে হবে। এলাকার নেতৃবৃন্দ ও জনগণকে একনিষ্ঠভাবে কাজে দেখতে পেলে অন্য এলাকার মানুষ এবং এমনকি বিদেশি বন্ধুগণও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
………..মুহম্মদ নুরুল ইসলাম। ওসমান কোর্ট, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম।
( লেখক একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও উন্নয়ন গবেষক)।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : কমিউনিটি ভাবনা বিভাগের লেখাগুলো লেখকের একান্ত নিজস্ব ভাবনা। কমিউনিটির জীবন মান উন্নয়নে যে কেউ লেখা পাঠাতে পারেন ইমেইলে। communitytvnews@gmail.com
























