সংবাদ বিশ্লেষণ :
বিভিন্ন দেশে সিটি মেয়রের যে প্রশাসনিক ক্ষমতা সে তুলনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার সিটি মেয়রগণের কোন ক্ষমতাই নেই। নিউইয়র্ক, লন্ডনসহ উন্নত সিটি সমূহের মেয়ররা প্রশাসনিকভাবে অনেক ক্ষমতাশালী । অন্যদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সিটি মেয়রগণের তেমন কোন ক্ষমতা নেই । তবে তাদের সদিচ্ছা ও জনগনের সেবা করার মানসিকতা থাকলেও প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারনে তা অনেকক্ষেত্রে পারেন না। এজন্য সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পাশাপাশি সিটি মেয়রের ক্ষমতা বাড়ানো বেশী প্রয়োজন বলে মতামত দিচ্ছেন অনেকে। স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের তাগিদ দিলেন সাবেক মেয়র এবং উন্নয়ন বিশ্লেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদগন।
এ বিষয়ে ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের প্রথম মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, জনদুর্ভোগ লাঘবে সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব যদি না থাকে, তবে এত ব্যয়বহুল এবং জটিল নির্বাচনের প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, কয়েকটি দেশের মেয়রের ক্ষমতা পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় মেয়র আসলে কতটা ক্ষমতাশালী।
কলকাতা শহরের মেয়র নির্বাচিত হন স্থানীয় কাউন্সিলরদের ভোটে । লর্ড মেয়র অব লন্ডন ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর উপরে অবস্থান করেন ক্ষেত্র বিশেষে।
অন্যদিকে নিউইয়র্ক মেয়রও প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। কিন্তু তিনি নিউইয়র্ক পুলিশ কমিশনারসহ সব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন। তিনি আরো বলেন, আইন মোতাবেক ১৯৮৯ সালে করপোরেশনের নির্বাচিত কমিশনারদের সঙ্গে সমন্বয় করে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ কার্যকর করা হয়। তৎকালীন সরকার কর্তৃক করপোরেশন আইন অনুযায়ী আমি মেয়র পদে নিয়োগ পাওয়ার পর রাজধানীর বাইরে কোনো ব্যক্তিকে প্রথম প্রতিমন্ত্রীর পদ ও মর্যাদা দেওয়া হয় । প্রথম নির্বাচিত করপোরেশন গঠিত হয় আমার সময়। সেখানে তিন প্রকারের কমিশনার বা কাউন্সিলর ছিল। যেমন, ওয়ার্ড কমিশনার, মহিলা কমিশনার এবং অফিশিয়াল কমিশনার। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক, গণস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ছিলেন অফিসিয়াল কমিশনার, যারা করপোরেশনের মাসিক সভায় উপস্থিত থাকতে বাধ্য ছিলেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯০ সালের দিকে ওয়ার্ড কমিশনার ও মহিলা কমিশনারদের উপসচিব পদমর্যাদা প্রদান করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। ১৯৯৩ সালের দিকে তৎকালীন জাতীয় সংসদে অফিশিয়াল কমিশনার পদগুলো বিলুপ্ত করে আইন প্রণয়ন করা হয়। বলা যায়, সেই থেকেই মেয়রের আইনগত কর্তৃত্ব, নগর সমন্বয় করা তথা নগর সরকার বা সিটি গভর্নমেন্ট ইত্যাদির বিলুপ্তি ঘটে । পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশন আইন সংশোধন হলেও অফিশিয়াল কমিশনার পদ সৃষ্টি হয়নি এবং মেয়রের পদ থাকলেও ক্ষমতা বাড়ে নি। তিনি মেয়রের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়াতে সিটি করপোরেশন আইন সংশোধনের আহ্বান জানান। তবে আইন সংশোধন করা না গেলে স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন অথবা চট্টগ্রাম নগর বা বৃহত্তর চট্টগ্রামের জন্য প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের অধীনে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ কমিটি সব প্রকল্প প্রণয়ন, যথাসময়ে বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতাসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য রক্ষায় কাজ করতে পারবে।
এ বিষয়ে সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ইঞ্জিনিয়ার আলী আশরাফ বলেন, আমাদের সংবিধানেই স্থানীয় সরকার শক্তিশালী ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কথা উল্লেখ আছে। তাই সেটির যথাযথ ও সঠিক প্রয়োগেই সিটি মেয়র অধিক ক্ষমতাশালী হতে পারে । কিন্তু আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক জঠিলতায় সে ক্ষমতার প্রয়োগ সম্ভব হয়ে উঠে না। এজন্য সরকারের নির্বাহী আদেশে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধির আইনকে পুনরুজ্জীবিত ও কার্যকরী করা যায়। কারন বর্তমান সরকারও চায় স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে দেশের তৃনমুল পর্যায়ে উন্নয়ন। এজন্য তিনি সিটি গভর্নমেন্ট সিস্টেম বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে উল্লেখ করেন।
























